ঢাকা ১৫ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আশঙ্কা বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান মিলটন বনাম ডাঃ শফিকুর রহমান –
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আসন ঢাকা-১৫। এই আসনে নির্বাচন করছেন বিএনপি’র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন । তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন জামাতের আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান। নির্বাচনে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে বলে ধারণা ভোটারদের। অন্যান্য নির্বাচনী এলাকার মতো এখানেও ভোটের উত্তাপ বিরাজ করছে। প্রার্থীরা যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। করছেন গণসংযোগ, অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। ভোটাররাও ভাবছেন প্রার্থীদের নিয়ে। চায়ের দোকান, পাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে বাসা-বাড়িতেও এখন আলোচনায় নির্বাচন। তবে দৈনিক জনজাগরণের তথ্য মতে ঢাকা ১৫ আসনে এখন পর্যন্ত ৭৩ শতাংশ ভোটার মনে করে এখানে ধানের শীষের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এগিয়ে আছেন অন্যদিকে ২২% ভোটার মনে করে জামাত-ইসলামির ডঃ শফিকুল ইসলাম ভোটারের ভোটে এগিয়ে আছেন। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করছে ১৫ আসনের জনগণ।
ঢাকা-১৫ আসনটি ঢাকা শহরের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। আগারগাঁও, তালতলা, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, কাফরুল ও মিরপুরের আরও কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে অনেক আগে থেকেই কাজ করছে জামায়াত। দলটির আমীর প্রার্থী হতে পারেন এমনটা ধরে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এবারই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয় নেতা হিসেবে তারও প্রভাব রয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে একজন জনপ্রিয় নেতা হিসাবে পরিচিত লাভ করেছেন শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। এ অবস্থায় ভোটের মাঠে আছে নানা হিসাবনিকাশ।
সরজমিন শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর, পীরেরবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভোটার ও প্রচারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, দুই প্রার্থীর প্রচারণায় রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল। ডা. শফিকুর রহমান তার জাতীয় পরিচিতি ও জামায়াতের সুসংগঠিত দলীয় কাঠামোর ওপর ভর করে এগোচ্ছেন। অন্যদিকে মিল্টনের প্রচারণার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে দীর্ঘদিনের স্থানীয় যোগাযোগ, নিয়মিত উপস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতা।
তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে দুই প্রার্থীর সামনেই। ডা. শফিকুর রহমান এর আগে ঢাকা ও সিলেটের বিভিন্ন আসন থেকে চারবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও বিজয়ের মুখ দেখেননি। অন্যদিকে মিল্টনকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল তবে আগামী এক সপ্তাহের ভিতরে এগুলো নিরসন হবে বলে দলীয় হাই কমান্ড সূত্রে জানা গেছে।এই আসনে বিএনপি’র মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন মামুন হাসান সহ একাধিক নেতা। নির্বাচনে এই নেতারা মিল্টনকে কতোটা সহযোগিতা করবেন তা নিয়ে ভোটারদের মাঝে প্রশ্ন রয়েছে। তবে দলীয় সূত্র বলছে মামুন হাসান শীঘ্রই প্রচারণায় শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের পক্ষে অংশগ্রহণ করবেন এর ফলে এ আসনে চিত্র পাল্টে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ৬৭ বছর বয়সী ডা. শফিকুর রহমান পেশায় চিকিৎসক। অপরদিকে ৫৬ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন পেশায় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী।
ঢাকা-১৫ আসনে মোট নিবন্ধিত ভোটার ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫০৭ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭০০ এবং নারী ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৬ জন। নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। এ আসনে তরুণ ভোটার, প্রথমবারের ভোটার, পোশাক শ্রমিক ও ভাসমান নগরবাসীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ।
প্রথমবার ভোট দেবেন নাজমুল হক। কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের পাশেই কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, বিগত সময়গুলো নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। এবারই প্রথম ভোট দেবো। একটু চিন্তাভাবনা করেই দিতে হবে। এ আসনে বিএনপি-জামায়াত দু’দলের লোকজনই কাজ করছেন। তবে জামায়াতের আমীরের জন্য এই আসনে আলোচনা আছে। স্থানীয়রা আবার মিল্টন ভাইকে নিয়ে চিন্তা করছে তরুণ প্রজন্ম কাছে তিনি অধিক জনপ্রিয়।
তরুণ ভোটার শারমিন সুমি জানান, কোনো দল করি না। তবে সুষ্ঠু ভোট হলে অবশ্যই প্রার্থী দেখে তার কাজকর্ম দেখেই ভোট দেবো।
ঢাকা-১৫ আসনে যাদের মনোনয়নপত্র বৈধতা পেয়েছে তারা হলেন- জামায়াতে ইসলামীর আমীর মো. শফিকুর রহমান, বিএনপি’র মো. শফিকুল ইসলাম খান, গণফোরামের এ. কে. এম. শফিকুল ইসলাম, জনতার দলের খান শোয়েব আমান উল্লাহ, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) মো. আশফাকুর রহমান এবং জাতীয় পার্টির মো. সামসুল হকের মনোনয়নপত্র।
পশ্চিম শেওড়াপাড়া বাজারের রাহি মিহাদ বোডিং স্টোরের মালিক মো. মিজানুর রহমান বলেন, মানুষ এবার অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ভোট দেবে। কে জিতবে বলা মুশকিল।
পশ্চিম শেওড়াপাড়া মাছ বাজারের দোকানি আব্দুল আজিজ বলেন, বিএনপি-জামায়াত দুই দলের কথাই শুনছি। শেষ পর্যন্ত কী হবে বলা যাচ্ছে না। তবে এবার মানুষ সুষ্ঠু ভোট দিয়ে এলাকার উন্নয়ন চায়।
কাজীপাড়ার তরুণ ভোটার নাজমুল হোসেন বলেন, দুই দলই আলোচনায় আছে এখানে। ভোটের মাঠ জমে উঠেছে। তবে প্রার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো না। হয়তো আরও কিছুদিন গেলে জনসংযোগ বাড়বে।
প্রচারণা থেমে নেই অনলাইনেও। দুইপক্ষই জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে অনলাইনে। এর অংশ হিসেবে মিল্টনের টিম তার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে গান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস ও ফটোকার্ড প্রচার করছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ডিজিটাল কৌশলে সুসংগঠিত অনলাইন বার্তার মাধ্যমে নিজেদের প্রচলিত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় পার্থক্য দুই প্রার্থীর। ডা. শফিকুর রহমানের বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা, আর মিল্টনের ঘোষিত আয় ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ডা. শফিকুর রহমানের স্থায়ী ঠিকানা সিলেটের সবুজবাগে হলেও বর্তমানে তিনি মিরপুরের বড়বাগে বসবাস করছেন। মিল্টনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা মিরপুর এলাকাতেই।
মামলা সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে করা ৩৪টি মামলার মধ্যে দু’টি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন এবং ৩২টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন। অন্যদিকে মিল্টনের বিরুদ্ধে ৫০টি মামলার কথা উল্লেখ আছে, যার বেশির ভাগই খালাস ও অব্যাহতির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার ভোট দিতে মানুষ মুখিয়ে আছে। তাই এককভাবে কোনো দলের দিকেই বলা যাচ্ছে না। জামায়াত আমীর আলাদা একটা পরিচিতি থাকলেও বিএনপি’র মিল্টনের স্থানীয় ও তরুণ প্রজন্মের কাছে অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং জনসংযোগ ও পরিচিতি বেশি।