বিশেষ প্রতিবেদকঃ যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া নৌবন্দরে সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসী হামলা, অপপ্রচার এবং শ্রমিক সংগঠনকে ঘিরে দ্বন্দ্বের ঘটনায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন-এর নেতাদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী চক্র পরিকল্পিতভাবে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে মিথ্যা অভিযোগ, রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং সহিংস হামলার পথ বেছে নিয়েছে। এতে করে নওয়াপাড়া নদীবন্দরে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া নদীবন্দর-এর গোল্ডেন টু (গোল্ডেল-২) ঘাট এলাকায় ফেডারেশনের নওয়াপাড়া শাখার অফিস সচিব মোঃ নিয়ামুল হক রিকোর ওপর সন্ত্রাসীরা পূর্বপরিকল্পিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় রিকো এবং বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ হাসান মুন্সী মাস্টার জাহাজ মালিকপক্ষের সঙ্গে পাওনা অর্থ নিয়ে আলোচনা করতে সেখানে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা ইট দিয়ে নিয়ামুল হক রিকোর মাথায় আঘাত করে এবং পরে লাঠি, রড ও কিল-ঘুষি দিয়ে তাকে মারধর করে গুরুতর আহত করে। স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ ভর্তি করা হয়।
এই হামলার ঘটনায় নওয়াপাড়া নদীবন্দরে অবস্থানরত শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরই প্রতিবাদে ১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় ফেডারেশনের নওয়াপাড়া শাখা কার্যালয়ের সামনে একটি বড় প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ হাসান মুন্সী মাস্টার। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাহারুল ইসলাম বাহার, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা। বিশেষ বক্তা ছিলেন শ্রমিক নেতা আশুতোষ বিশ্বাস, সভাপতি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ যশোর জেলা ও উপদেষ্টা বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা। এছাড়া বক্তব্য দেন মোঃ জামাল মাস্টার, সহ-সভাপতি এবং মোঃ জসিম মাস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা। সভা পরিচালনা করেন নাজমুল হোসাইন, অফিস কর্মকর্তা বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন নওয়াপাড়া শাখা এবং সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ অভয়নগর থানা।
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, “নওয়াপাড়া লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন” নামে একটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সম্প্রতি তারা ফেডারেশনের নেতাদের রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়। এছাড়া ওই সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ শাহাদাত হোসেন মাস্টার অতীতে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল বলে দাবি করেন শ্রমিক নেতারা।
নেতারা আরও জানান, এই ঘটনার পেছনে একটি পুরনো আর্থিক বিরোধ রয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি আবদুর রহমানের মালিকানাধীন নাইটার এমভি সেভেন সীজ-৪ নামের একটি জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ার পর ক্ষতিপূরণ নিয়ে মেসার্স এম আর শিপিং কর্পোরেশন ও মেসার্স এম এম শিপিং ট্রান্সপোর্টের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বিষয়টি খুলনায় ফেডারেশনের বিভাগীয় কার্যালয়ে শালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলেও নির্ধারিত এক কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ পুরোপুরি পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি জাহাজটি নওয়াপাড়ায় অবস্থান করলে পাওনা অর্থের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে দাবি করা হয়।
শ্রমিক নেতারা আরও অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে নওয়াপাড়া নৌবন্দরে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, জাহাজ থেকে মাসোহারা আদায়, শ্রমিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত। ইকবাল হোসেন, সাইফুল, হৃদয় ও রানা নামের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে অভয়নগর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। তবে অভিযোগ দায়েরের কয়েকদিন অতিবাহিত হলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ২১ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকাল ১১টায় ফেডারেশনের নওয়াপাড়া শাখা কার্যালয়ে সভাপতি নূরুল হুদা মাস্টারের সভাপতিত্বে এক জরুরি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত শ্রমিক নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার সকাল ৬টা থেকে নওয়াপাড়া নদীবন্দরে কর্মরত সকল নৌযান শ্রমিক অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করবেন।
ফেডারেশনের অফিস কর্মকর্তা নাজমুল হোসাইন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই কর্মসূচি সফল করতে নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট, কয়লা, খাদ্য শস্য ব্যবসায়ী সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, কর্তৃপক্ষ এবং সকল শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন দমাতে সন্ত্রাসী হামলা ও অপপ্রচার চালানো হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।